অবসর কত প্রকার ও কি কি? বিবরণ দিন।
সরকারি চাকরিতে অবসর বলতে একজন সরকারি কর্মচারীর চাকরির নির্ধারিত সময় শেষে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে অবসর গ্রহণ করা বোঝায়। এটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বয়সে বা নির্দিষ্ট সময় সরকারি চাকরিতে কাজ করার পর ঘটে। অবসরকে মোটামুটি ৫ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
১। স্বাভাবিক অবসর (Normal Retirement);
২। অসামর্থের কারণে অবসর (Retirement due to incapacitation);
৩। ঐচ্ছিক অবসর (Optional Retirement);
৪। বাধ্যতামূলক অবসর (Compulsory Retirement);
৫। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর (Compulsory Retirement as a penal measure);
নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১। স্বাভাবিক অবসর (Normal Retirement):
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৪৩ (১) বলা হয়েছে যে, এই আইনের অন্যান্য বিধান সাপেক্ষে—
(ক) একজন সরকারি কর্মচারী তাহার বয়স ৫৯ (ঊনষাট) বৎসর পূর্তিতে, এবং
(খ) একজন মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মচারী তাহার বয়স ৬০ (ষাট) বৎসর পূর্তিতে, অবসর গ্রহণ করিবেন।
(২) সরকার বা, ক্ষেত্রমত, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ উপ-ধারা (১) এর দফা (খ) এ উল্লিখিত মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ বা পরিচিতি যাচাই করিতে পারিবে:
তবে শর্ত থাকে যে, মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভকারী ব্যক্তি এইরূপ যাচাই হইতে অব্যাহতি প্রাপ্ত হইবেন।
আবার গণ কর্মচারী অবসর আইন, ১৯৭৪ এর ৪ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক গণ কর্মচারীকেই ৫৭ বৎসর বয়স পূর্তিতে (বর্তমানে ৫৯ বৎসর) অবসর গ্রহণ করিতে হইবে। তবে ছুটি পাওনা সাপেক্ষে ১ বৎসর এল পি আর ভোগ করিতে পারবেন। এই ধারার সম্প্রতিক সংশোধনীতে অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি বাতিল করে তার স্থলে অবসর উত্তর ছুটি (Post Retirement leave) চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ৫৯ বছর বয়স পূর্তিতে একজন গণ কর্ম-চারীকে অবশ্যই স্বাভাবিক অবসর গ্রহণ করিতে হইবে।
২। অসামর্থের কারণে অবসর (Retirement due to incapacitation)
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৪৬(১) তে বলা হয়েছে যে, কোনো সরকারি কর্মচারী শারীরিক অথবা মানসিক অসামর্থ্য বা বৈকল্যের কারণে সরকারি কর্ম সম্পাদনে নিজেকে অক্ষম মনে করিলে, চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের আবেদন করিতে পারিবেন এবং এতদুদ্দেশ্যে গঠিত মেডিকেল বোর্ড কর্তৃক স্থায়ীভাবে অক্ষম ঘোষিত হইলে, সরকার বা, ক্ষেত্রমত, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ তাহাকে অক্ষমতাজনিত কারণে চাকরি হইতে অবসর প্রদান করিতে পারিবে।
(২) উপ-ধারা (১) যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সরকারি কর্মচারীর শারীরিক অথবা মানসিক অক্ষমতার উদ্ভব হলে সরকার বিধি অনুযায়ী যথোপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা সুবিধা প্রদানের বিধান প্রণয়ন করিতে পারিবে।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, পাট-১ এর বিধি- ৩২১ অনুযায়ী কোন সরকারি কর্মচারী শারীরিক বা মানসিক বৈকল্যের কারণে প্রজাতন্ত্রের চাকুরীর জন্য বা প্রজাতন্ত্রের যে শাখায় নিযুক্ত আছেন, ঐ শাখার চাকুরীর জন্য স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে প্রজাতন্ত্রের চাকুরী হতে অবসর গ্রহণ করলে তিনি অক্ষমতাজনিত অবসর প্রাপ্ত হবেন। এক্ষেত্রে তার চাকুরীর পরিমাণ কমপক্ষে ১০ বৎসর পূর্ণ না হলে তিনি কোন পেনশন সুবিধা প্রাপ্য হবেন না।
অক্ষমতাজনিত অবসরের আবেদন পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ উক্ত কর্মচারীকে পরীক্ষার জন্য চিকিৎসক পর্যদ (Medical Board) বরাবর প্রেরণ করতে পারেন। চিকিৎসক পর্ষদ কর্মচারীকে স্থায়ীভাবে অক্ষম ঘোষণা করলে কর্তৃপক্ষ তাকে অক্ষমতাজনিত কারণে চাকুরী হতে অবসর প্রদান করতে পারেন। সেক্ষেত্রে পেনশন সুবিধাদি পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকুরী কমপক্ষে ১০ বৎসর পূর্ণ হতে হবে।
৩। ঐচ্ছিক অবসর (Optional Retirement)
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৪৪(১) তে বলা হয়েছে যে, চাকরির মেয়াদ ২৫ (পঁচিশ) বৎসর পূর্ণ হইবার পর যে কোনো সময় একজন সরকারি কর্মচারী অবসর গ্রহণের অভিপ্রেত তারিখের অন্যূন ৩০ (ত্রিশ) দিন পূর্বে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিকট চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের অভিপ্রায় লিখিতভাবে ব্যক্ত করিয়া অবসর গ্রহণ করিতে পারিবেন।
(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন ব্যক্তকৃত অভিপ্রায় চূড়ান্ত হিসাবে গণ্য হইবে এবং উহা সংশোধন বা প্রত্যাহার করা যাইবে না।
গণ কর্মচারী অবসর আইন,১৯৭৪ এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী চাকুরীর মেয়াদ ২৫ বৎসর একজন গণ-কর্মচারী অবসর গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখের গণ-কর্মচারী অবসর আইন, পূর্তির পর যে কোন সময় কমপক্ষে ৩০ দিন পূর্বে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত নোটিশ প্রদান পূর্বক চাকুরী হতে অবসর গ্রহণ করতে পারেন। তবে এই সুযোগ একবার গ্রহণ করা হলে, তা আর সংশোধন বা প্রত্যাহার করা যাবে না।
৪। বাধ্যতামূলক অবসর (Compulsory Retirement)
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৪৫তে বলা হয়েছে যে, কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ (পঁচিশ) বৎসর পূর্ণ হইবার পর যে কোনো সময় সরকার, জনস্বার্থে, প্রয়োজনীয় মনে করিলে কোনোরূপ কারণ না দর্শাইয়া তাহাকে চাকরি হইতে অবসর প্রদান করিতে পারিবে :
তবে শর্ত থাকে যে, যেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন গ্রহণ করিতে হইবে।
গণ-কর্মচারী অবসর আইন, ১৯৭৪ এর ৯(২) ধারা অনুযায়ী চাকুরীর মেয়াদ ২৫ বৎসর পূর্তির পর সরকার যে কোন সময় কোনরূপ কারণ দর্শানো ব্যতিরেকেই যে কোন গণ-কর্মচারীকে জনস্বার্থে চাকুরী হতে অবসর প্রদান করতে পারবেন। সরকার ব্যতিত অন্য কোন অধীনস্থ নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে না।
৫। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর (Compulsory Retirement as a penal measure)
শৃংখলামূলক কারণে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণপূর্বক দন্ড হিসেবে যে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়, তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর বলা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসর একটি গুরুদন্ড। শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার কারনে অদক্ষতার জন্য বা অন্য যে কোন ধরনের অদক্ষতার জন্য, অসদাচরণের জন্য, ডিজারশনের জন্য এবং দুর্নীতি বা নাশকতামূলক অপরাধের জন্য এ প্রকার দন্ড আরোপ করা যায়। কোন সরকারি কর্মচারীর নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অধঃস্তন কোন কর্তৃপক্ষ তার উপর কোন গুরুদন্ড আরোপ করতে পারবে না।
অবসর গ্রহণের প্রকারভেদ কর্মচারীর অবস্থা, চাকরির মেয়াদ এবং কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। প্রতিটি প্রকারভেদের নিজস্ব সুবিধা ও শর্তাবলী রয়েছে।
0 Comments